ভূমিকাঃ

ড্রাম সিডার দিয়ে বীজ বপনকাদাময় জমিতে ড্রাম সিডার দিয়ে সারিবদ্ধভাবে সরাসরি বীজ বপন ধান চাষের একটি সহজ ও উদীয়মান প্রযুক্তি। এ যন্ত্র ব্যবহার করে ধান উৎপাদনে সময়, শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশেই যেমন ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনে এখন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্য পক্ষে প্রচলিত পদ্ধতিতে চারা রোপণ করে ধান চাষের জন্য বীজতলায় চারা তৈরি, উত্তোলন, রোপণ ইত্যাদি কাজ বেশ শ্রমসাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। আউশ, আমন ও বোরো সব মৌসুমেই এ যন্ত্র দিয়ে ধান চাষ করা সম্ভব, তবে বোরো মৌসুমই হচ্ছে বেশি উপযোগী। বিশেষ করে নিচু এলাকার এক ফসলি বোরো জমি ও দুই ফসলি জমিতে যেখানে সেচের সুব্যবস্থা আছে সেখানে এ পদ্ধতিতে ধান চাষ উপযোগী হবে।

Drum Seeder Technology

পরিচিতি ও ব্যবহার পদ্ধতিঃ

এটি প্লাস্টিকের তৈরি ছয়টি ড্রাম বিশিষ্ট একটি বীজ বপন যন্ত্র। এটি কাদাময় জমিতে সারি করে সরাসরি বীজ বপন করা যায়। এ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি, চারা উত্তোলন ও রোপণ করতে হয় না। তাই সময়, শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে কমানো যায়। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে ফসল রোপা পদ্ধতির চেয়ে ১০-১৫ দিন আগে পাকে। ড্রাম সিডার ব্যবহারের জন্য জমি উত্তমরূপে চাষ ও মই দিয়ে কাদাময় করে নিতে হবে। এরপর জমিকে যথাসম্ভব সমতল করতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন কোথায়ও পানি দাঁড়িয়ে না থাকে। ভাল বীজ ২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে ২-৩ দিন জাগ দিয়ে ভালোভাবে অঙ্কুরিত করে নিতে হবে যেন অঙ্কুরের দৈর্ঘ্য ৪-৫ মিলিমিটার বা একটি ধানের সমান লম্বা হয়। ড্রামে বীজ ভরার আগে অঙ্কুরিত বীজ ১-২ ঘন্টা ছায়ায় ছড়িয়ে দিয়ে বাতাসে শুকিয়ে নিলে ভাল হয়। উক্ত বীজ ড্রামের এক তৃতীয়াংশ খালি রেখে ভরতে হবে। ড্রামের গায়ে আঁকা ত্রিভুজাকৃতি চিহ্ন যেন সবসময় সামনের দিকে থাকে। এবার হাতল ধরে সামনে চলতে থাকলে ছয়টি ড্রাম থেকে বারো লাইনে বীজ বপন হতে থাকবে।হাতলের সাথে ২-৩ ফুট লম্বা চিকন এক খন্ড কলা গাছ বেঁধে নিলে (হালকা মই হিসাবে) জমিতে পায়ের দাগ বা গর্ত মুছে যাবে।

বোরো মৌসুমে ডিসেম্বর মাসের প্রথম (পৌষের তৃতীয়) সপ্তাহে বীজ বপন করতে হবে। আমন মৌসুমে পানি নিস্কাশনের সুযোগ আছে এমন মাঝারি উঁচু জমিতে জুলাইয়ের প্রথম (আষাঢ়ের তৃতীয়) সপ্তাহে বীজ বোনা যায়। তবে বীজ বপনের অন্তত ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই এমন সময় বেছে নিতে হবে। কারণ বপনের পর পর ভারী বৃষ্টি হলে বীজের সারি ও বীজ এলামেলো হয়ে যেতে পারে।

বপনের প্রথম ৪-৫ দিন জমিতে পানির প্রয়োজন নেই। মাটি ভিজা থাকলেই যথেষ্ট। পরে গাছের বৃদ্ধির সাথে খাপ খাইয়ে প্রথমে ছিপছিপে পানি এবং কিছুটা বড় হয়ে গেলে রোপা পদ্ধতির অনরূপ পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। আগাছা দমনের জন্য ব্রি-উইডার বেশ উপযোগী। উইডার প্রয়োগের পরে হাত দিযে সারির ভিতরের আগাছা পরিস্কার করা দরকার। আগাছা দমনের জন্য আগাছানাশক ব্যবহার অধিক ফলপ্রসূ। বোরো মৌসুমে বীজ বপনের ৭-১০ দিনের মধ্যে এবং আমন ও আউশে ৪-৬ দিনের মধ্যে ২০-২৫ মিলিলিটার রনস্টার অথবা ১০-১২ মিলিলিটার রিফিট ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে সমানভাবে স্প্রে করতে হবে। জমিতে ২-৩ সেন্টিমিটার দাঁড়ানো পানি থাকা অবস্থায় আগাছানাশক প্রয়োগ করতে হবে।

ড্রামসিডার ব্যবহারের সুবিধা:

১। বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা বছরে প্রায় শতকরা এক ভাগ। এ অবস্থায় সীমিত জমিতে বাড়তি ফসলের জন্য হেক্টর প্রতি ফলন বাড়াতে হবে।

২। অকৃষি ক্ষেত্রে শ্রম বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধির ফলে কৃষিকাজের জন্য শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এর ফলে শ্রমিক মজুরি বেড়ে যাওয়ায় সনাতন পদ্ধতির ধান চাষ ব্যয়বহুল ও অলাভজনক হয়ে পড়ছে। ড্রাম সিডার যন্ত্রের সাহায্যে কাদা মাটিতে সরাসরি অঙ্কুরিত বীজ বপন একটি শ্রম-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে ধান চাষাবাদকে লাভজনক করা যেতে পারে।

৩। অধিকন্তু এ পদ্ধতিতে প্রচলিত রোপণের তুলনায় ধানের জীবনকাল প্রায় ১০-২০ দিন কমে যায় এবং ফলন প্রায় ১০-২০% বেশি হয়।

৪। ড্রাম সিডার দিয়ে বপন কৃষকের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত একটি পদ্ধতি। কারণ এর ফলে কৃষককে কাদা-পানির মধ্যে কোমর বাঁকা করে অনেক সময় ধরে চারা রোপণ করতে হয় না।

কৃষকের মাঠে ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বোনা পদ্ধতিতে ফলন গড়ে প্রায় ১৫% থেকে ২০% বেশি পাওয়া যায় এবং ধান ১০ থেকে ১২ দিন আগে কাটা যায়। ড্রাম সিডার পদ্ধতিতে আবাদ করলে রোপণের তুলনায় আমন মৌসুমে হেক্টর প্রতি প্রায় ৬,০০০ টাকা এবং বোরো মৌসুমে প্রায় ৮,০০০ টাকা অধিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।

সতর্কতাঃ
১। বপনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টি হলে বীজ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
২। জমি অসমতল হলে কিংবা ক্ষেতে পানি জমে থাকলে অঙ্কুর পচে যেতে পারে।
৩। যথাযথ অঙ্কুরোদ্‌গম না হলে বীজ বেশি লাগে এবং চারা সমভাবে গজায় না।
৪। যে জমিতে বেশি আগাছা জন্মায় সেখানে আগাছা নাশক ব্যবহার করা জরুরি।
৫। বপনের পরে প্রথম ৭ দিন পাখি ও হাঁস-মুরগির উপদ্রব হতে পারে।
৬। আমন মৌসুমে জমি তৈরির দিন এবং বোরো মৌসুমে পরের দিন বীজ বপন করা উত্তম। আমন মৌসুমে মাঝারি উঁচু জমিতে বৃষ্টি এড়িয়ে বীজ ফেলতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ আধুনিক ধানের চাষ (ব্রি) থেকে মো. সাইফুল রাজা এবং http://www.protikhon.com

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ১৪, ২০১৬