ভূমিকাঃ

প্রচলিত পদ্ধতিতে কৃষকগণ ধানের জমিতে সবসময় কিছু না কিছু দাড়ানো পানি রেখে থাকেন। ফলশ্রুতিতে, ধান উৎপাদনে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু সে তুলনায় ধানের ফলন তো বাড়েই না বরং কুশি উৎপাদন ব্যহত হওয়া, রোগ-পোকার আক্রমন বেড়ে যাওয়ায় কোন কোন ক্ষেত্রে ফলন কমে যায়। অঞ্চল বা মাটি ভেদে ১ কেজি ধান উৎপাদন করতে কৃষকভাইয়েরা ৩০০০-৫০০০ লিটার পানি ব্যবহার করে থাকেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বলে গবেষণায় প্রতীয়মানহয়েছে। IRRI এবং BRRI যৌথভাবে ধানের ফলনের কোন তারতম্য না ঘটিয়ে পানি সাশ্রয়ের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেযার নাম দেয়া হয়েছে পর্যায়ক্রমে জমি ভিজানো এবং শুকানো সেচ পদ্ধতি (Alternate Wetting and Drying-AWD)”| তাদের উক্ত গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভাল ফলন পাবার জন্য ধান ক্ষেতে সব সময় দাঁড়ানো পানি রাখারপ্রয়োজন নেই। তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পে AWD পদ্ধতিতে সেচ প্রদান করে পানির অপচয় রোধপূর্বক সরবরাহকৃত পানিদ্ধারা অধিক জমি চাষ করা সম্ভব।

AWD সেচ পদ্ধতি কি ?

AWD সেচ পদ্ধতি হলো ধান ক্ষেতে পরিমিতভাবে/প্রয়োজনমত সেচ দেয়া। ধান ক্ষেতে একটি ছিদ্রযুক্ত প্লাষ্টিক বাবাঁশের পাইপ বা মিনারেল পানির বোতল বসিয়ে মাটির ভিতরের পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করে সেচ দেয়া।

ইহা ধান উৎপাদনে সেচের পানি সাশ্রয় পদ্ধতি। এতে সাধারন পদ্ধতি অপেক্ষা ২০-২৫ ভাগ পানি সাশ্রয় হয়।

উদ্দেশ্য :

  •  মূল্যবান সেচের পানি ও জ্বালানী সাশ্রয় করা।
  • সেচ খরচ কমানো।

সুবিধাসমূহ :

  • রোটেশন পদ্ধতিতে সেচ দেয়া সম্ভব।
  • পানি ও জ্বালানী সাশ্রয় হয়।
  • ফলনের কোন তারতম্য হয় না।
  • কম খরচ, বেশী লাভ।
  • পরিবেশ বান্ধব।

AWD পদ্ধতি ব্যবহারের যৌক্তিকতা :

বোরো মৌসুমের স্বল্পপানি দিয়ে প্রদান সম্ভব নয়। তাই রোটেশন পদ্ধতি অবলম্বন করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জমিতে পানি সরবরাহ করা একান্ত প্রয়োজন। AWD সেচ পদ্ধতি রোটেশন পদ্ধতিতে সেচ প্রদান করতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ এ পদ্ধতিতে মাটি ভেদে ৫-৭ দিন পর পর সেচ প্রদান করলে ফসলের কোন ক্ষতিপরিলক্ষিত হয় না। তাছাড়া বোরো ধানের চারা রোপন থেকে ধান কাটা পর্যন্ত জাতভেদে মোটামুটি ৯৫ খেকে ১১০ দিন সময়লাগে। সাধারণ পদ্ধতিতে সেচ প্রদান করলে উক্ত সময়ে ৮৮৯ থেকে ১৫২৪ মিলিমিটার পানির প্রয়োজন। AWD পদ্ধতি ব্যবহার করলে ২০ থেকে ৩০ ভাগ পানির সাশ্রয় সম্ভব।

পর্যবেক্ষণ পাইপের বর্ণনা :

পাইপের ব্যাস হবে ৭-১০ সেমিঃ এবং লম্বা ৩০ সেমিঃ। পাইপটির উপরের ১০ সেমিঃ ছিদ্রহীন এবং নীচের ২০ সেমিঃ ছিদ্রযুক্তহবে। পাইপটিতে ৫ সেমিঃ পর পর ৩ সুতি ব্যাসের ড্রিল বিট দিয়ে ছিদ্র করতে হবে। ছিদ্রযুক্ত একখন্ড পাইপের মূল্য আনুমানিক২০০ টাকা। বাঁশ বা মিনারেল পানির বোতল দিয়ে পাইপটি তৈরী করতে খরচও কম।

[images picture_size=”fixed” lightbox=”yes” class=”” id=””]
[image link=”” linktarget=”_self” image=”http://agrivisionbd.com/wp-content/uploads/2015/12/AWD.jpg” alt=””]
[/images]

যেভাবে পাইপটি জমিতে বসাবেন :

পাইপটির উপরে ছিদ্রহীন ১০ সেমিঃ মাটির উপরে থাকে, যাতে সেচেরপানির মাধ্যমে আবর্জনা পাইপের ভিতরে না ঢুকে। নীচের ছিদ্রযুক্ত ২০ সেমিঃমাটির নীচে থাকবে, যাতে মাটির ভিতরের পানি ছিদ্র দিয়ে পাইপে সহজেপ্রবেশ করতে বা বেরিয়ে যেতে পারে।

সেচ প্রদান পদ্ধতি :

১। এক একর পরিমাণ ধান ক্ষেতের ২/৩ জায়গায় গর্ত করে প্লাষ্টিক/বাঁশ/মিনারেল পানির বোতল উলম্ব বা খাঁড়া ভাবে বসাতেহবে।

২। ধানের চারা রোপনের ১০-১৫ দিন পর্যন্ত জমিতে ২-৪ সেমিঃ দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে। তারপর থেকে এ পদ্ধতিটি কার্যকরহবে।

৩। এটি চালুর পর, প্রতিবার সেচের সময় এমন পরিমাণ পানি দিতে হবে যাতে জমিতে ৫ সেমিঃ গভীরতায় পানি থাকে।অতঃপর পানি কমতে কমতে পানির স্তর যখন পাইপের ভিতর ২০ সেমিঃ নীচে দেখা যাবে, তখন আবার সেচ দিতে হবে। এঅবস্থায় আসতে মাটি ভেদে ৫-৮ দিন সময় লাগবে। এভাবে ফুল আসা পর্যন্ত সেচ দিতে হবে।

৪। ফুল আসার পর ২ সপ্তাহ পর্যন্ত জমিতে সব সময় ২-৪ সেমিঃ পানি রাখতে হবে। এ সময়ে পানির ঘাটতি না হয় সেটা লক্ষ্যরাখতে হবে।

৫। অতঃপর ধান কাটার ২ সপ্তাহ আগেই সেচ বন্ধ করতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর 

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : মে ২২, ২০১৬