কৃষক পর্যায়ে ভেজাল রাসায়নিক সার সনাক্তকরণের সহজ উপায়

বাজারে বিভিন্ন রকম রাসায়নিক সার পাওয়া যায়। ফসলের পুষ্টি উপাদান প্রাপ্যতার উপর ভিত্তি করে বাজারে সচরাচর যেসব সার পাওয়া যায় সেগুলো হলো-

নাইট্রোজেন সমৃদ্ধঃ ইউরিয়া, এ্যামোনিয়াম সালফেট, ডিএপি
ফসফরাস সমৃদ্ধঃ টিএসপি, এসএসপি, ডিএপি
পটাশিয়াম সমৃদ্ধঃ মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), সালফেট অব পটাশ
সালফার সমৃদ্ধঃ জিপসাম
দস্তা বা জিংক সমৃদ্ধঃ জিংক সালফেট, জিংক অক্সাইড, জিংক ইডিটিএ
বোরণ সমৃদ্ধ সারঃ বোরাক্স/সোহাগা, বোরিক এসিড, সলুবোর
ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধঃ ম্যাগনেসিয়াম সালফেট
ম্যাঙ্গানিজ সমৃদ্ধঃ ম্যাঙ্গানিজ সালফেট

 

ইউরিয়া সারঃ

ইউরিয়া সার ভেজালের প্রকৃতিঃ

ইউরিয়া সারে যে সকল ভেজাল দেয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে মিস ব্রান্ডিং অর্থাৎ এক প্রকার সারের প্যাকেটের মধ্যে অন্য এক প্রকার সার পাওয়া যায়। কোন কোন সারে গুড়া চুন ও লবনের মিশ্রন দেখা যায়।

ভেজাল ইউরিয়া সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ

একই উৎপাদনকারী কোম্পানীর ইউরিয়া সারের দানাগুলোর আকার সাধারণতঃ সমআকৃতির। পরিবহনজনিত কারণে সামান্য উনিশ-বিশ হতে পারে কিন্তু দশ-বিশ হবে না। যদি অনেক ছোট ও বড় আকারের দানা দেখা যায়, তাহলে সামান্য পরিমাণ ছোট ও বড় দানাগুলোকে আলাদা করে নিন। ছোট দানাগুলো জিহবার আগায় লাগান। লবণ মিশ্রিত থাকলে লবণের স্বাদ পাওয়া যাবে। এক চা চামচ  ইউরিয়ার সাথে দুই চা চামচ পানি মেশালে খুব দ্রুত সার গলে দ্রবণ তৈরী করবে। এ দ্রবণে হাত দিলে ঠান্ডা অনুভুত হবে। সারে চুনের গুড়োর মিশ্রণ থাকলে পানি কিছুটা গরম অনুভুত হবে এবং ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত অ্যামোনিয়া উৎপন্ন হবে। একটি চা চামচে সামান্য পরিমাণ (বড় দানা ৪-৫টি) ইউরিয়া নিয়ে তার সাথে সামান্য কলি চুন (পান খাওয়া চুন) মিশিয়ে মোমবাতির  আগুনে গরম করলে ঝাঝালো গন্ধযুক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস (আগের রাতে মাংশ, মাছ, ডিম খেয়ে সকালে প্রশ্রাবে যে গন্ধ পাওয়া যায় উৎপন্ন হবে অর্থাৎ সারে যে নাইট্রোজেন আছে তা নিশ্চিত হলো। ছোট দানার ইউরিয়া সারেও এভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে সেটি ইউরিয়া সার।


টিএসপি সারঃ

টিএসপি সারে ভেজালের প্রকৃতিঃ
দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় টিএসপি সারের বস্তায় এসএসপি বা এফএমপি ভর্তি করে বাজারজাত করা হয়। কখনও কখনও জৈব পদার্থের সাথে জিপসাম, ডলোমাইট ও কালো রং মিশিয়ে সেন্ট্রিফিউজ মেশিনের সাহায্যে ভেজাল টিএসপি সার তৈরী হরা হয়।

ভেজাল টিএসপি সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ
সঠিক টিএসপি সারে ঘ্রাণ নিলে অম্ল স্বাদযুক্ত (পেটে গ্যাষ্ট্রিক বা গ্যাস হলে মুখ দিয়ে মাঝে মাঝে টকস্বাদের যে গন্ধ পাওয়া যায়) ঝাঁঝালো গন্ধ থাকবে। দুটি বুড়ো আঙ্গুলের নখের মাঝে রেখে চাপ দিলে সহজে ভাঙ্গবে না কিন্তু নকলটি ভেঙ্গে যাবে। টিএসপি সারের বিভিন্ন ভাঙ্গা অংশের রং বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। এক চা চামচ টিএসপি সার আধা গ্লাস ঠান্ডা পানিতে মেশালে সার সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয়ে ডাবের পানির মত পরিষ্কার দ্রবণ তৈরী করবে। ভেজাল থাকলে ঘোলা দ্রবণ তৈরী করবে। অধিক ভেজাল থাকলে নিচে তলানি পড়বে।


এমওপি/পটাশ সারঃ

ভেজাল এমওপি সার সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ
এমওপি সার লাল হলেও এর রঙ হাতে লাগে না, ভেজাল সারের রং ভিজা হাতকে রঙিন করতে পারে।

ভেজাল এমওপি সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ
এমওপি সারের রং লাল হলেও এ রং হাতে লাগে না। কোন দ্রব্যে রং মেশালে ভেজা হাতে সে রং লাগবে। হাতের তালুতে সামান্য এমওপি সার নিয়ে তার মধ্যে সামান্য পানি দিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকলে আসলে এমওপি সার সম্পূর্ণভাবে গলে যাবে এবং পানি বেশ ঠান্ডা অনুভূত হবে। সার গলে যাওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে আসল এমওপি সার আস্তে আস্তে গলে দানাগুলো ছোট হতে থাকলেও লাল রং দেখা যাবে। কিন্তু রং মিশ্রিত কোন জিনিস তার মধ্যে থাকলে প্রথমে লাল রং উঠে যাবে, পরে ছোট কণায় আর লাল রং দেখা যাবে না। বালি, কাঁচের গুড়া মিশ্রিত থাকলে তা মোটেও গলবে না। কাঁচের গুড়া, বালু বা ইটের গুড়া তলানী আকারে জমা হবে। এক চা চামচ এমওপি সার আধা ঠান্ডা পানিতে মিশালে সার সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয়ে পরিষ্কার দ্রবণ তৈরী করবে।


জিপসাম সারঃ

জিপসাম সার ভেজালের প্রকৃতিঃ
জিপসাম সারের দাম কম হওয়ায় সাধারণত কোন ভেজাল দেখা যায় না।  তবে ওজন বাড়ানোর জন্য পানি মেশানো হয়। কখনও কখনও চুনের গুড়া ও মাটির মিশ্রণ দেখা যায়।

ভেজাল জিপসাম সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ
আসল জিপসাম সার সাদাটে পাউডারের মত। ইহা ভেজা হলেই বুঝতে হবে এতে পানি মিশানো হয়েছে। বাতাসের আর্দ্রতায় এটির গায়ে তুলা তুলা ভাব দেখা যায় গায়ে তুলা তুলা ভাব না থাকলে বুজতে হবে পানি মেশানো হয়েছে অথবা ভেজাল সার। এক চা চামচ পরিমাণ জিপসাম সারে ১০-১৫ ফোঁটা পাতলা হাইড্রোক্লোরিক এসিড আস্তে আস্তে মিশালে যদি বুঁদবুঁদ দেখা দেয় তবে বুঝতে হবে নমুনাটি ভেজাল।


বোরণ সারঃ

বোরণ সারে ভেজালের প্রকৃতিঃ
বরিক এসিডের তুলনায় বোরক্সে দাম কম হওয়ায় বরিক এসিডের প্যাকেটে বোরক্স ভর্তি করে বিক্রি করা হয়। আবার সলুবর ও বরিক এসিড দেখতে সাদা বিধায় সাদা রং এর অপেক্ষাকৃত কম দামী রাসায়নিক পদার্থ যেমন সোডিয়াম সালফেট বা ক্যালসিয়াম সালফেট (জিপসাম) প্যাকেটজাত করে বরিক এসিড বা সলুবর হিসেবে বাজারজাত করা হয়।

ভেজাল বোরণ সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ
বোরণ সার হালকা মিহি পাউডারের মত। আধা গ্লাস পানিতে এক চামচ বরিক এসিড বা সলুবর মিশালে সার সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং কোন তলানী পড়বে না। সলুবর ওজনে হালকা বিধায় বরিক এসিড  বা বোরাক্সের তুলনায় এক প্যাকেট দ্বিগুন বড় হয়।

দস্তা বা জিংক সারঃ

দস্তা সারে ভেজালের প্রকৃতিঃ
দস্তা সারে অনেক ধরনের ভেজাল দেখা যায়। মনোহাইড্রেট জিংক সালফেট লিখিত প্যাকেটে অপেক্ষাকৃত কম দামের হেপ্টাহাইড্রেট জিংক সালফেট ভরে বাজারজাত করা হয়। হেপ্টাহাইড্রেট জিংক সালফেটে জিংক বা দস্তার পরিমাণ কম থাকে। কখনও কখনও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট অথবা খাবার লবণ ও জিপসামের মিশ্রণ অথবা খাবার লবণ ও চুনের মিশ্রণকে জিংক সার হিসেবে বাজারে বিক্রয় করা হয়।

ভেজাল দস্তা সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ
মনোহাইড্রেট জিংক সালফেট দেখতে দানাদার কিন্তু হেপ্টাহাইড্রেট জিংক সালফেট স্ফটিকার ও আঁকাবাকা। হেপ্টাহাইড্রেট জিংক সার সম্পূর্ণভাবে পানিতে গলে যায় এবং কোন তলানি পড়ে না। কিন্তু মনোহাইড্রেট জিংক সার পানিতে সম্পূর্ণ গলে না এবং দ্রবণ ঘোলাটে হয়। এই দ্রবণে সোডিয়াম কার্বনেট মিশালে কোন বুদবুদ উঠেনা। তবে সোডিয়াম কার্বনেটের তলানী পড়ে এবং দ্রবণ স্বচ্ছ হয়। চিলেটেড জিংকের সার সাদা অথবা হলদেটে পাউডারের মত। ইহা  দ্রুত পানিতে গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরী করে। যে কোন ধরণের সামান্য দস্তা সার হাতের তালুতে নিয়ে তাতে সামান্য পানি দিয়ে হাতের আঙ্গুল দিয়ে নড়াচড়া করতে থাকলে সার গলতে থাকবে এবং হাতের তালুর পানি আস্তে আস্তে গরম হতে থাকে। পানি যত বেশি গরম হবে বুঝতে হবে ঐ সারের নমুনায় তত বেশি দস্তা আছে অর্থাৎ সারটি ভাল দস্তা  সার।


এনপিকেএস মিশ্র সারঃ

এনপিকেএস মিশ্র সার ভেজালের প্রকৃতিঃ
এনপিকেএস মিশ্র সারে শুধু উপাদন খরচ কমিয়ে আনার জন্য সঠিক অনুপাতে সরল সারের ভৌত মিশ্রণ ঘটানো হয়। এছাড়া ভেজাল হিসেবে রঙ, মাটি ও ডলোমাইট ব্যবহার করে ভেজাল এনপিকেএস মিশ্র সার তৈরী করা হয়।

ভেজাল এনপিকেএস মিশ্র সার সনাক্তকরণ পদ্ধতিঃ
এনপিকেএস মিশ্র সারে বিভিন্ন সরল সার থাকে বিধায় সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে এর ভেজালের মাত্রা ও প্রকুতি নির্ণয় করা সহজ নয়। তবে মাটি ও ডলোমাইট ব্যবহার করে ভেজাল এনপিকেএস মিশ্র সার তৈরী করা হলে ইহা আঙ্গুলের চাপে সহজেই গুড়া হয়ে যাবে এবং দানার ভিতর ও বাইরের রং ভিন্ন ভিন্ন হবে।


তথ্যসূত্রঃ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই), ঢাকা (সার পরীক্ষা পদ্ধতির লিফলেট)

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ৮, ২০১৬