ভূমিকাঃ

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষকের চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসায় ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক বালাইনাশকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন চাষীরা। আর মানুষের খাদ্য বিষযুক্ত হতে শুরম্ন করে, যার ফলে মানব দেহে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। মানবদেহে রোগব্যাধি বর্তমানে দেশের জাতীয় একটি সমস্যা আর এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলায় হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড গ্রাম পর্যায়ের কৃষকদের নিয়ে শুরম্ন করে জৈব বালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহার নিয়ে নতুন এক কার্যক্রম। উপজেলার পূর্ব বলরামপুর গ্রামের কৃষক ও কৃষানীদের জৈব বালাইনাশক তৈরি করার পদ্ধতি হাতে কলমে শিখিয়ে কৃষি কাজে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করছেন এস এম শাহিন হোসেন। শুধু পূর্ব বলরামপুর গ্রামে নয় কালিগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি গ্রামের কৃষকদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্চাসেবী এ প্রতিষ্ঠান হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড। কি ভাবে ফসলকে পোকামাকড় ও কীট পতঙ্গ থেকে মুক্ত রাখা যায় এবং ভাল ও বিষমুক্ত ফসল ঘরে তোলা যায় সেই বিষয়টি সব কৃষকদের পাশাপাশি বাড়ীর মহিলারাও আয়ত্ব করেছেন এবং জৈব বালাইনাশক তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করছেন। জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করলে ফসলের কোন ড়্গতি হয়না বরং অতিরিক্ত খরচ ছাড়ায় ভাল ফসল উৎপাদন করা যায় ।

জৈব বালাইনাশক তৈরির উপকরণঃ

পাতাসহ নিসিন্দা গাছ ১ কেজি।
কালোমেঘ গাছ ১/২ কেজি।
বিষ কাটালী গাছ ১ কেজি।
নিম পাতা ১ কেজি।
নিমের ছাল ১/২ কেজি।
ভাটির পাতা ১ কেজি।
মেহগনির ফল ১ কেজি।
গরম্নর চুনা ১ কেজি।
পানি ৫ কেজি।

জৈব বালাইনাশক তৈরির পদ্ধতিঃ

উপকরণগুলো কুচি কুচি করে কেটে পর্যায়ক্রমে নিসিন্দা, কালোমেঘ, বিষকাটালী, নিমপাতা ও ছাল, ভাটির পাতা, মেহগনির ফল মাটির পাত্রে ঢুকিয়ে তারপর ১ কেজি গরম্নর চুনা ও ৫ কেজি পানি দিয়ে পলিথিন দিয়ে মুখ বেধে দিতে হবে। এরপর পাত্রটি ছায়া ও ঠান্ডাযুক্ত স’ানে ১৪ দিন রেখে দিতে হবে যাতে করে উপকরণ গুলো ভালভাবে পঁেচ যায়। ১৪ দিন পর প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি জৈব বালাইনাশকটি ব্যবহার উপযোগি হবে।

ব্যবহার বিধিঃ

প্রাকৃতিক গাছপালা দিয়ে তৈরি জৈব বালাইনাশক উপকরণগুলো ১৪ দিন পাত্রে পঁচানোর পর সেটা সংগ্রহ করে ছাকুনি দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। ছেঁকে নেওয়া রস বা জৈব বালাইনাশক সবজি বা ফসলে ব্যবহার করা যাবে। তবে নিদৃষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। সেড়্গেত্রে কৃষক ভাইয়েরা ৯ লিটার পানির সাথে ১ লিটার জৈব বালাইনাশক মিশিয়ে ফসলে বা সবজি ড়্গেতে ব্যবহার করতে পারবে। এভাবে একবার স্প্রে করলে সবজি ড়্গেত পোকা মাকড় বা কীট পতঙ্গ থেকে রেহায় পাবে।

জৈব বালাইনাশক তৈরীর পদ্ধতি ও তার ব্যবহারঃ

ভুয়ো পোকা দমনেঃ

সবজি ক্ষেতে প্রায় দেখা যায় ভুয়ো পোকার আক্রমন। শুধু সবজি ক্ষেতে না, পাট বা অন্যান্য গাছের পাতায়ও ভুয়ো পোকার আক্রমন পরিলক্ষিত হয়। আর এই পাতা খেয়ে ফেলা বা কচি ডগা কেটে দেওয়া ভুয়ো পোকার আক্রমন থেকে রড়্গা পেতে জৈব বালাইনাশক তৈরি করে স্প্রে করলে ভুয়ো পোকার আক্রমন থেকে রড়্গা পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে এই জৈব বালাইনাশকটি তৈরি করতে যা যা লাগবে তা হলো- রয়না বা পিতরাজ গাছের ছাল ১ কেজি, সাজনার ছাল ১ কেজি, গরম্নর চুনা ৫ কেজি, পেয়াজ বাটা বা টুকরা করা ১/২ কেজি এবং ৩০ লিটার পানি। উপকরণ গুলো টুকরো টুকরো করে গরম্নর চুনা ও পানির সাথে একত্রে ২১ দিন রেখে দিতে হবে। () ২১ দিন পর মিশ্রিত উপকরণগুলো ছেকে রস বা জৈব বালাইনাশক ৪ লিটার নিয়ে ১৬ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে সবজি বা ফসলে স্প্রে করলে ভুয়ো পোকার আক্রমন থেকে রড়্গা পাওয়া যাবে।

মাজড়া দমনেঃ

ধান চাষে সবচেয়ে বড় পতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মাজড়া পোকা। আর মাজড়া পোকা দমনে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে খুব ভাল ফল পেতে পারেন কৃষকরা। মাজড়া পোকা দমন করতে জৈব বালাইনাশক তৈরি করতে হলে যে উপকরণ গুলো লাগবে তা হলো- ১ কেজি মেহগনির ফলের বীজ, ১ কেজি নিম পাতা, ১/২ কেজি নিম গাছের ছাল, ১ কেজি ভাটির পাতা, ৫ কেজি গরম্নর চুনা ও ৩৫ লিটার পানি। উপকরণগুরো একটি পাত্রে একসাথে মিশিয়ে ২১দিন ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে রেখে দিতে হবে। তারপর ২১ দিন পর এটা ছেকে নিয়ে ধান ড়্গেতে ব্যবহার করা যাবে। মাজড়া দমনে জৈব বালাইনাশক পরিমান মত ব্যবহার করতে হবে। সেড়্গেত্রে ৪ লিটার জৈব বালাইনাশক যুথী ও ১৬ লিটার পানি একত্রে মিশিয়ে ধান ড়্গেতে স্প্রে করলে মাজড়া পোকা আক্রমন করতে পারবে না এবং মাজড়া পোকা যদি ধান ড়্গেতে আক্রমন করে থাকে তবে জৈব বালাইনাশক যুথী ব্যবহার করলে মাজড়া পোকা দমন হবে।

জৈব ভিট বেড়াঃ

আমরা ফসলের ড়্গেতে গরম্ন ছাগলের উপদ্রব থেকে রড়্গা পেতে মজবুত করে বেড়া দিয়ে থাকি। তাতে করে কৃষকের ফসল উৎপাদনে খরচের মাত্রা বেড়ে যায়। ফসল উৎপাদনে খরচ কমাতে এবং গবাদি পশুর উপদ্রব থেকে রড়্গা পেতে ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার মলিস্নকপুর গ্রামের মনোয়ারা বেগম যুথী উদ্ভাবন করেছেন জৈব পদ্ধতিতে ভিট বেড়া। অদৃশ্য এই বেড়া তৈরি করা যায় জৈব পদ্ধতিতেই। সেড়্গেত্রে মাছের আশটে ও মাছ ধোয়ার পানি ৭ দিন একটি পাত্রে রেখে ৭দিন পর জমির চারিপাশে ছিটিয়ে দিলে ঐ জমিতে গরম্ন ছাগলের আক্রমন থেকে রড়্গা পাওয়া যায়। এ বিষয়ে হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ও কাজ করে যাচ্ছে কৃষকদের সাথে।

হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ইমো নামে আরেকটি বালাইনাশক আবিষ্কার করেছে যেটি ফসলের পাশাপাশি গরম্নর খাদ্য তৈরীতে, মাছের খাদ্য তৈরীতে এবং সর্বোপরি মাছ পরিবহণে ফরমালিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। যার আশানুরম্নপ ফলাফলও পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশিস্নষ্টরা দাবি করছেন।

যদি কালিগঞ্জ উপজেলার মত দেশের প্রতিটি অঞ্চলে কৃষকরা জৈব বালাইনাশক তৈরি করে ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করে তাহলে একদিন আমরা পাবো বিষমুক্ত খাদ্য। আর সেই লড়্গ্যে আপনি আমি আমরা সচেতন হয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে জৈব বালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহারের জন্য। তাহলে সারাদেশে বিষমুক্ত সবজি ও খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্রঃ http://www.somewhereinblog.net/

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারী ১২, ২০২১