বীজতলা বলতে উত্তমরূপে প্রস্তুতকৃত ছোট আকারে এমন এক খণ্ড জমিকে বোঝায়, যেখানে বীজ বপন করলে অঙ্কুরোদগমের উপযুক্ত পরিবেশ পায় এবং যথার্থ পরিচর্যার মাধ্যমে উপযোগী চারা উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ বীজতলা বলতে এমন এক স্থানকে বোঝায় যেখানে বীজ থেকে চারা উৎপান করা হয় এবং মূল জমিতে রোপণের আগ পর্যন্ত নিবিড় পরিচর্যা করা হয়। বীজতলাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয় যথা-
(ক) শুকনো বীজতলা : যেখানে জমি শুকনো অবস্থায় চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে বীজ বপন করতে হয়।
(খ) ভেজা বীজতলা : যেখানে জমিতে পানি থাকাবস্থায় চাষ ও মই দিয়ে সমান করে এতে অঙ্কুরোদগম বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা হয়।
(গ) ভাসমান বীজতলা : যেখানে পানিতে ভাসমান ভেলা, কচুরিপানা বা অন্য কোনো ভাসমান বস্তুর ওপর পলিথিন বিছিয়ে এতে সামান্য মাটি দিয়ে সেখানে বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা হয়।
বোরোধানের জন্য ভেজা বীজতলা তৈরি করাই ভালো, তবে উপকূল অঞ্চলে প্রয়োজনে ভাসমান বীজতলা করা যেতে পারে। এখানে বোরোধান চাষের জন্য ভেজা বীজতলা তৈরির পদ্ধতি আলোচনা করা হলো (এ ক্ষেত্রে এক শতাংশ জমিতে চারা উৎপাদন করে এক বিঘা বা ৩৩ শতাংশ জমি রোপণ করা যায়):
১. স্থান : সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত আলো- বাতাসপূর্ণ এঁটেল দোআঁশ মাটিতে ভেজা বীজতলা করা ভালো।
২. জমি তৈরি : জমিতে পানি থাকাবস্থায় দু-তিনটি চাষ দিয়ে পাঁচ-সাত দিন রেখে দিয়ে আবার দু-তিনটি চাষ দিয়ে মাটি মই দিয়ে সমান করে বীজতলা তৈরি করতে হবে।
৩. সার প্রয়োগ : প্রতি শতাংশে তিন-চার মণ পচা গোবর (পচেনি এমন গোবর ব্যবহার করা যাবে না), ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ টিএসপি, ১০০ গ্রাম পটাশ সার জমি তৈরির সময় শেষ চাষের সাথে মাটিতে ভালোভাবে মিশে দিতে হবে।
৪. বেড তৈরি : প্রতিটি বেডের প্রস্থ হবে ১ মিটার এবং দৈর্ঘ্য হবে জমির দৈর্ঘ্য পর্যন্ত। দু’টি বীজতলার মাঝে ৬০ সেন্টিমিটার ও জমির চারপাশে ২৫ সেন্টিমিটার নালা রাখতে হবে (নালা তৈরির মাটি বেডে তুলে দিতে হবে, যাতে বেড নালা থেকে ৭-১০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়)।
৫. বীজ বপন : বোরোধানের অঙ্কুরিত বীজ বোনার সময় একটু জোর দিয়ে বেডে ফেলতে হবে, যাতে বীজগুলো কাদায় গেঁথে যায়।
বীজ জাগ দেয়া : অঙ্কুরোদগমের জন্য যে পরিমাণ তাপের দরকার হয় সে পরিমাণ তাপ সৃষ্টি করাকে জাগ দেয়া বলা হয়।
শুকনো বীজ একটানা ২২-২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজে রেখে তার পর তুলে সামান্য ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে এর পানি বের করে দিতে হবে।
মওসুমভেদে বীজের জাগ দেয়ার সময় ভিন্ন হয়। শীতকালে বোরোধানে সাধারণত ৪৮-৭২ ঘণ্টাকাল জাগ দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে হালকা রোদ এবং আলো-বাতাসপূর্ণ স্থানে মাটিতে পাটের তৈরি বস্তা বা খড় বিছিয়ে এর ওপর ধানের বস্তা রেখে প্রয়োজনে সামান্য খড় বা ভেজা চট দিয়ে ঢেকে দেয়া যেতে পারে (তবে এটি নির্ভর করে শীতের তীব্রতার ওপর এবং হাইব্রিড বীজ হলে এর নিয়ম অনুসরণ করতে হবে)। এতে ধান বীজের ভ্রণজাগরিত হয়, খোসা নরম হয়, ভ্রণ মূলকে অঙ্কুরিত করে ফলে বীজের ঘুম ভেঙে যায়। ভালোভাবে অঙ্কুরিত বীজ সহজে বীজতলায় চারা উৎপাদন করতে পারে। 

সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত (লেখক : কৃষিবিদ এম এ মজিদ)

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারী ১২, ২০২১