গুটি ইউরিয়াঃ

বাজারে প্রাপ্ত সাধারণ ইউরিয়া থেকে ব্রিকেট মেশিনের সাহায্যে গুটি ইউরিয়া তৈরি করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে তিন ধরনের গুটি ইউরিয়া তৈরি হয়।
• ০.৯ গ্রাম ওজনের ইউরিয়ার ৩টি গুটি ইউরিয়া বোরো ধান এবং ২টি গুটি ইউরিয়া আউশ/আমন ধানের চার গোছায় মধ্যবর্তী স্থানে পুঁতে দিতে হয়। অথবা
• ১.৮ গ্রাম ওজনের ইউরিয়ার ১টি গুটি আউশ/আমন ধানের চার গোছার মধ্যবর্তী স্থাতে পুঁতে দিতে হয়।
• ২.৭ গ্রাম ওজনের ইউরিয়ার ১টি গুটি বোরো ধানের চারা গোছার মধ্যবর্তী স্থানে পুঁতে দিতে হয়।

গুটি ইউরিয়া ব্যবহারঃ

ধান চাষে ইউরিয়া সাধারণত ছিটিয়ে প্রয়োগ করা হয়। এভাবে প্রয়োগের ফলে ইউরিয়ার কার্যকারিতা অনেকখানি কমে যায় এবং শতকরা ৭০ ভাগ পর্যন্ত অপচয় হয়ে থাকে। এ অপচয় তিন ভাবে হয়ে থাকে। প্রথমত: গ্যাস হয়ে বাতাসে মিশে যায়। দ্বিতীয়ত: পানির সাথে মিশে এক জমি থেকে আরেক জমিতে চলে যায়। তৃতীয়তঃ পানি সাথে শিশে চুষে মাটির গভীরে চলে যায়। এর ফলে ধান গাছ খাদ্য হিসেবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইউরিয়া গ্রহণ করতে পারে না। আইএফডিসি এবং অন্যান্য দেশী বিদেশী সংস্থার গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা গেছে যে, মাটির ৭-১০ সে. মি. (৩ থেকে ৪ ইঞ্চি) নিচে গুটি ইউরিয়া পুতে দেয়া হলে ইউরিয়ার কার্যকারিতা দিগুন এরও বেশি বেড়ে যায়। এছাড়াও ধানের ফলন শতকরা ২০-২৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
গুটি ইউরিয়া কেন দানাদার ইউরিয়ার প্রয়োগ অপেক্ষা বেশি লাভজনক?
• গাছে নাইট্রোজেন প্রাপ্তি দীর্ঘায়িত হয় এবং বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়- গুটি ইউরিয়া প্রয়োগে নাইট্রোজেন এর অপচয় বহুলাংশে হ্রাস পায়। এটা গ্যাস হয়ে বাতাসে মিশে যায় না, পানির স্রোতে/চুয়ে অন্য জমি বা মাটির বেশি গভীরে চলে যায় না।
• ইউরিয়া কম লাগে- ইউরিয়ার কার্যকারিতা বাড়ার ফলে এর প্রয়োজনীয়তা জমিভেদে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ পর্যন্ত কমে যায়।
• ফলন ও কৃষকের আয় বাড়ে- বিভিন্ন সমীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে যে, ছিটিয়ে ইউরিয়া ব্যবহারের তুলায় গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের ফরে বিঘাপ্রতি ধানের ফলন জমি ভেদে ১৬৫ কেজি পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
• জমি উন্নত হয়- গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের ফলে মাটি উন্নত হয় এবং অধিক ফলনে সহায়তা করে।

গুটি ইউরিয়া ব্যবহার পদ্ধতিঃ

লাইনে রোপণকৃত ধানের জন্য-
১. গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের পাঁচ থেকে সাত দিন পূর্বে 2020 সে. মি (88 ইঞ্চি), ব্রি ধান ২৯ এর ক্ষেত্রে (96 ইঞ্চি) লাইন থেকে লাইন এবং চারা থেকে চারার দূরত্বে ধানের চারা রোপণ করুন ।
২. ধানের চারা রোপণের ১০-১২ দিনের মধ্যে মাটি শক্ত হওয়ার আগে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করুন।
৩. জমিতে যখন ২-৩ সেমি (১ ইঞ্চি) পরিমাণ পানি থাকে সে সময় গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা সহজ হয়।
৪. প্রয়োগের সময় লুঙ্গির ভাঁজে বা কৌটার মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গুটি ইউরিয়া নিন যাতে লাইনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাওয়া যায়।
৫. জমির ডান দিক থেকে গুটি প্রয়োগ শুরু করুন। ধানের চারার এক এবং দুই b¤^i লাইনের প্রতি চার গোছার মাঝখানে মাটির ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি (হাতের আঙ্গুলের সমান দীর্ঘ) নিচে গুটি ইউরিয়া পুঁতে দিন (চিত্র-১)। বোরো ধানে প্রতি চার গোছার জন্য ০.৯ গ্রাম ওজনের ৩টি অথবা ২.৭ গ্রাম ওজনের ১টি গুটি প্রয়োগ করুন। কাদা যদি নরম না থাকে তাহলে স্থাপনকৃত স্থানগুলিকে কাদা দিয়ে ঢেকে দিন। আউশ/আমন ধানে প্রতি চার গোছার জন্য ০.৯ গ্রাম ওজনের ২টি অথবা ১.৮ গ্রাম ওজনের ১টি গুটি প্রয়োগ করুন।
৬. গুটি প্রয়োগ করে জমির শেষ প্রান্তে এসে প্রয়োজনে আবার গুটি নিন এবং পূর্বের ন্যায় পরবর্তী তিন ও চার b¤^i লাইনে প্রতি চার গোছার মাঝখানে গুটি প্রয়োগ করে সামনে এগিয়ে যান।
৭. অনুরূপভাবে আবার জমির শেষ প্রান্তে এসে পাঁচ ও ছয় b¤^i লাইনের মাঝখানে একই নিয়নে গুটি প্রয়োগ করুন (চিত্র-২)
৮. এ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ জমিতে গুটি প্রয়োগ শেষ করুন। লক্ষ্য রাখবেন যেন গুটি প্রয়োগকৃত স্থানে পা না পড়ে।
৯. কোন কোন সময় দেখা যায় কৃষকগণ একবারে ২ অথবা ৪ অথবা ৬ লাইনে গুটি প্রয়োগ করতে সুবিধা বোধ করেন।
১০. গুটি প্রয়োগের ৩০ দিনের মধ্যে জমিতে নামা উচিত নয়। যদি এর মধ্যে জমিতে নামাতেই হয় তবে যে স্থানে পা রেখে গুটি প্রয়োগ করা হয়েছিল সে স্থানে পা রেখে জমিতে নামতে পারেন।
১১. গুটি প্রয়োগের পর জমিতে প্রয়োজনীয় পানি রাখতে হবে যাতে জমির মাটি ফেঁটে না যায়।

অন্যান্যভাবে রোপণকৃত ধানের জন্যঃ

এলোমেলো ভাবে রোপণকৃত ধানের জমিতেও গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গুটি একটি স্থানে স্থাপনের পর ৪০ সেমি (১৬ ইঞ্চি) দুরত্ব বজায় রেখে ডানে বায়ে এবং সামনের দিকে গুটি স্থাপন করে এগিয়ে যেতে হবে। এতে হয়ত প্রতি গোছার সমদূরত্বে গুটি স্থাপন সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্ত ফলনের দিক থেকে ফসল ভালই হয়ে থাকে।

গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের সুফল লাভে অবশ্য করণীয় অন্যান্য কার্যক্রমঃ

• ইউরিয়া ছাড়া প্রয়োজনীয় অন্যান্য সব সার ব্যবহার করুন।
• উচ্চ ফলনশীল জাতের ভাল বীজ ব্যবহার করুন।
• যে সব জমিতে পানি কম চুষে যায়, সে সব জমিতে গুটি প্রয়োগ করুন। অর্থ্যাৎ বেলে মাটিতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করবে না।
• ভাল ফলন লাভের জন্য লাইনে রোপণকৃত ধানে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করুন।
• সময়মত পোকামাকড় দমন করুন।
• সময়মত সেচ দিন যাতে পানির অভাব না হয়।
• সময়মত আগাছা দমন করুন।

গুটি ইউরিয়ার অন্যান্য ব্যবহারঃ

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট এর মাঠ পর্যায়ে গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা যায় যে, বাঁধাকপি, ফুলকপি এবং বেগুন ফসলে সুপারিশকৃত ইউরিয়ার পরিমাণ থেকে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ কম পরিমাণ গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করেও লাভজনক ফলন পাওয়া গেছে। কিছু কিছু কৃষক মাছ চাষেও পুকুরে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার আরম্ভ করেছেন।

গুড়া ইউরিয়া বনাম গুটি ইউরিয়াঃ

• গুঁড়া ইউরিয়ার কার্যকারিতা মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ
• নাইট্রোজেন গ্যাস আকারে উড়ে যায়
• পানির সাথে চুঁয়ে মাটির গভীর চলে যায়
• গুটি ইউরিয়া তুলনায় শতকরা ৩০-৪০ ভাগ বেশি পরিমাণে গুড়া ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়।
• ২-৩ বার ইউরিয়া ছিটাতে হয়।
• ফসলের উৎপাদন কম হয়।
• কৃষকের লাভ কম হয়।
• বাতাস ও পানি দূষণ করে।
• আগাছা বেশি হয়।

• গুটি ইউরিয়ার কার্যকারিতা প্রায় শতকরা ৬০-৭০ভাগ।
• নাইট্রোজেন গ্যাস আকারে উড়ে যেতে পারে না।
• পানির সাথে চুঁ মাটির গভীরে চলে যেতে পারে না।
• ৩০-৪০ ভাগ কম ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়।
• একবার প্রয়োগই যথেষ্ট।
• উৎপাদন শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
• গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে অধিক লাভ হয়।
• বাতাস ও পানি পরিস্কার থাকে।
• আগাছা কম হয়।

পরিবেশের উপর প্রভাবঃ

• পরিবশে দূষণমুক্ত থাকে কারণ গ্যাস আকারে নাইট্রোজেন বাতাসে মিশতে পারে না।
• পানির সাথে ইউরিয়া মিশে যায় না, বিধায় পানি কম দূষিত হয়।

আরো বিস্তারিত জানতেঃ এখানে ক্লিক করুন

তথ্যসূত্রঃ http://www.infokosh.gov.bd এবং ধান গবেষণা ইনস্টিটউট, গাজীপুর।

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০২১