পার্চিং একটি ইংরেজী শব্দ। ফসলের জমিতে ডাল, কঞ্চি, বাশের খুঁটি এগুলো পুতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে পাখি ক্ষতিকারক পোকার মথ, বাচ্চা, ডিম খেয়ে পোকা দমন করে। পোকা দমনের এই পদ্ধতিকে পার্চিং বলা হয়ে থাকে । ফসলের পোকা দমনের এই পদ্ধতি অত্যান্ত কম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশবান্ধব। পার্সিং দুই প্রকার হতে পারে যথা-ডেড পার্সিং ও লাইভ পার্সিং। মরা ডালপালা পুতেঁ দিলে তা হবে ডেড পার্সিং এবং ধইঞ্চা, কলা গাছ ইত্যাদি জীবন্ত পুতেঁ দিলে তা হবে লাইভ পার্সিং।

ডেড পার্চিংঃ

মডেল-১ (RPM-1):

*  গোড়ালীতে বা নিচের অংশে গিড়া রেখে ৬- ৬.৫ ইঞ্চি লম্বা করে বাশের খন্ড কাটতে হবে। খন্ডের নিচের দিকে গিড়া থাকলে কেউ সহজে খুঁটি তুলতে পারবে না। খুঁটির নিচের অংশে ২ – ২.৫ ইঞ্চি লম্বা বাশের ফালি তারকাটা দিয়ে আরাআরিভাবে আটকিয়ে দিতে হবে। খুঁটির নিচের অংশে সুচালু বা চোকা করা যাবে না। সুচালু করলে অন্য কেউ সহজে তুলে নিয়ে যাবে। প্রতিটি খন্ড থেকে ১২-১৮ টি ফালি বা খুঁটি হবে। খুঁটি বেশী মোটা করলে চুরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই যথাসম্ভব বাশের বাতার খুঁটি পাতলা (পরিমিত) করতে হবে।

model_1

*  খুঁটি বা ফালির আগায় প্রায় ১০- ১২ ইঞ্চি সেকশন করে চারটি ফালি তুলতে  হবে। ১০- ১২ অংশের সেকশন সুতলির সাহায্যে নিচের দিকে এমনভাবে হেলে আনতে হবে যেন পাখি বসার উপযোগী হয়।

*  একটি সূচালো ও শক্ত বাশের ফলা দিয়ে অথবা শাবল এর সহায়তায় ৮- ১০ ইঞ্চি গভীর করে গোড়ার আল সহ পার্চিং নরম মাটিতে পুঁতে দিতে হবে। মাটি একটু শক্ত হলে বা জমে গেলে সেই পার্চিং অন্য কেহ সহজে তুলে নিতে পারবে না। এতে করে পার্চিং চুরি বন্ধ হবে।

* পার্চিং টিকে চুনের দ্রবণে চুবালে অনেকটা ধবধবে সাদা দেখাবে এবং ক্ষেতের অনেক দুর থেকে দৃষ্টিগোচরে আসবে। চুনের পরিবর্তে সাদা পেইন্ট দিয়েও পার্চিং এর উপরের অংশকে রং করা যাবে। ইতিমধ্যে দেখা গেছে সাদা রং দেয়া পাখি বসতে শুরু করেছে।

*  রং বা সাদা না করেও পাখি বসানোর ব্যবস্থা করা যায় ।

* পার্চিং আইল থেকে বেশ দুরে দেয়াই শ্রেয় এবং জমির যে অংশে চলাচলের অসুবিধা আছে সেখানে স্থাপন করা ভাল। পার্চিং এর খুটি সরাসরি মাটিতে না পুঁতে একটি শাবল বা সুচালো অন্য কোন কিছু দিয়ে চাপা গর্ত করে সেখানে গভীর ভাবে স্থাপন করে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে।

*  এক বিঘা জমিতে ৬-৮ টি পার্চিং দিতে হবে ।

মডেল-২  (RPM-2):

*  RPM-1 এর অনুরুপ খুঁটি তৈরি করে তার উপরের অংশে ডালের আগা, ছো্ট ঝোপ ঝাড়ের কর্তিত অংশ, এবং শুকনা মরিচ গাছ, শুকনা বেগুন গাছ বা শাখা বা কঞ্চি বেধে দিতে হবে। ডাল বা কঞ্চি লম্বালম্বি ভাবে না বেধে আড়াআড়ি ভাবে বেধে দিলে পাখি বসতে সুবিধা হবে। ডাল/কঞ্চি/ঝাড় অন্তত  ২-৩ টি স্থানে বাঁধন দিতে হবে।

model_2

অনেক দুর থেকে তা দৃষ্টি গোচরে আসবে।

*  পার্চিং ক্ষেতে স্থাপনের পদ্ধতি RPM-1 এর অনুরুপ।

লাইভ পার্চিংঃ

মডেল-৩  (RPM-3):

*  লাইভ পার্চিং বা আফ্রিকান ধৈঞ্চা (Sesbania rostrata) দিয়ে পার্চিং এর ব্যবস্থা করা যায়। দেশী ধৈঞ্চা দিয়েও লাইভ পার্চিং করা যায় তবে দেশী ধৈঞ্চার পার্চিং বেশীর ভাগ  ক্ষেতে মারা যায়।

*  রংপুররের মাটিতে উপকারী অনুজীবের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারনে কোন কোন জমিতে কাটিং এর সফলতা ভাল হয় না। আমন মৌসুমে ৪র্ সাইজের পলিব্যাগে আফ্রিকান বা দেশী ধৈঞ্চার চারা তৈরি করে সেই চারা ব্যাগ সহ (ব্যাগের তলা সামান্য কেটে দিয়ে) ক্ষেতে বসিয়ে দিলে বেশ সবল পার্চিং তৈরি হয়।

Live Pierching

*  ৪০-৪৫ দিনের আফ্রিকান ধৈঞ্চার গাছ থেকে প্রতি গাছে ২-৩ টি প্রায় ২.৫-৩ ফুট লম্বা সাইজের কাটিং নিতে হয়।

*  ধান রোপনের ২-৩ দিনের মধ্যে আফ্রিকান ধৈঞ্চার কাটিং লাগাতে হয়। ৩ দিনের বেশী বিলম্ব হলে সফলতার হার ক্রমান্বয়ে কমে আসবে।

*  রোদের সময় কাটিং না লাগিয়ে বৃষ্টির সময় লাগালে সফলতার হার বাড়বে।

* লাইভ পার্চিং ঝোপালো হলে পরিমিত ছাটাই করে দেয়া দরকার।

*  এক (১) বিঘা জমিতে ৬ টি লাইভ পার্চিং করা দরকার।

*  আমন ধান কাটার সময় পার্চিং এর আফ্রিকান ধৈঞ্চার বীজ পরিপক্ক হয়। তাই ধান কাটার সময় এবং বীজ সংগ্রহ করে ভালভাবে শুকিয়ে পরবর্তী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।

মডেল-৪  (RPM-4):

*  আমন মৌসুমের ন্যায় বোরো মৌসুমেও আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশী ধৈঞ্চা দিয়ে লাইভ পারচিং করা সম্ভব। তবে কাটিং এর সফলতার হার খুবই কম। তাই এ কাজে পলিব্যাগে তৈরি ধৈঞ্চার চারার ফলাফল বেশ ভাল হয়।

*  বোরো মৌসুম বা শীতকালে লাইভ পার্চিং করার জন্য আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশী ধৈঞ্চার পুরাতন বীজ ভালভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। এই পুরাতন বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা সাধারনত ৫০-৭০% পাওয়া যায়। আমন ধান ক্ষেতে স্থাপিত আফ্রিকান ধৈঞ্চার আর্লি ফ্লাস থেকে নভেম্বর মসের ১ম সপ্তাহে পরিপক্ক নতুন বীজ পাওয়া যায়।  নতুন বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা প্রায় ৯০-১০০% পাওয়া যায়।

model_4

*  পলিব্যাগে পট মিক্সার ভরে প্রতি ব্যাগে ১-৩ টি বীজ দিতে হবে। পলিব্যাগে বীজ দেয়ার সময় এখানে অধিক গুরুত্বপূর্ন। যে কোন উপায়ে নভেম্বর মাসের ১০ তারিখের পূর্বে পলিব্যাগে বীজ দিতে হবে। বীজ বুনতে বিলম্ব করলে চারার বাড়বৃদ্ধি থেমে থাকবে।

*  বীজ বোনার পর পলিব্যাগ রোদে রাখতে হবে এবং পানি দেয়া সহ সকল যত্নাদি যথানিয়মে নিতে হবে।

*  ২৫ নভেম্বের থেকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে চারাকে কমপক্ষে ১০-১৪ ইঞ্চি বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিসেম্বরে চারার বাড় বৃদ্ধি না হলেও গাছে ফুল আসবে সেই ফুল ভেঙ্গে দেয়া ভাল হবে তবে ফুল ভেঙ্গে না দিলেও চলবে।

*  ১০-১৪ ইঞ্চি সাইজের চারা ব্যাগ সহ (ব্যাগের তলা সামান্য কেটে দিয়ে) বোরো ধান রোপনের পর যথা সম্ভব তারাতারি লাগাতে হবে। শীতে চারার বৃদ্ধি কিছুটা কমে থাকলেও, শীত কমার সাথে সাথে চারার বৃদ্ধি শুরু হবে।

*  প্রতি ১ বিঘা জমির জন্য  ৬-৮ টি চারা লাগাতে হবে ।


ভিডিও দেখুনঃ

তথ্যসূত্রঃ এগ্রিনিউজবিডি.কম ওয়েবসাইট এবং ভিডিওঃ কৃষিবিদ তালহা জুবায়ের মাসরুর, উপজেলা কৃষি অফিসার, চুয়াডাঙ্গা সদর।

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২১