আখের অন্ত:বর্তীকালীন পরিচর্যাঃ

রোপণের পর থেকে আখ কাটার পূর্ব পর্যন্ত জমিতে করনীয় কাজগুলোকে আন্ত:পরিচর্যা হিসাবে পরিচিত।

আগাছা পরিস্কার ও মাটি আলগা করন :
আখ রোপণের পর জমিতে জোঁ এলে মাটি আলগা করে দিতে হবে। মাটি আলগা করনের সময় ক্ষেতে আগাছাগুলো পরিস্কার করে দিতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে যে, আখের কুশি সৃষ্টিকালীন সময়ে অতিরিক্ত মাটি চারার গোড়ায় না পড়ে। এতে কুশি সৃষ্টি বিঘ্ন ঘটে। ইক্ষু রোপনের পর চার মাস পর্যন্ত অবশ্যই জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।

গ্যাপ পূরণ :
সনাতন পদ্ধতিতে চাষকৃত আখের ক্ষেতে নির্দিষ্ট দূরত্বে সুষমভাবে চারা না গজানোর কারণে জমিতে অনেক গ্যাপ থেকে যেতে পারে। গ্যাপ পূরণ করার জন্য ইক্ষু রোপনের সময় একই জাতের বীজ দিয়ে পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করে রাখতে হবে এবং মূল জমিতে ইক্ষু রোপণের ৪০/৪৫ দিনের মধ্যে ঐ চারা দিয়ে গ্যাপ পূরণ করে দিতে হবে।

আখের গোড়ায় মাটি দেয়া :
কুশি বের হওয়া শেষ হলে অর্থাৎ আগাম আখের বেলায় হেক্টর প্রতি ২.০-২.৫ লক্ষ (ঝাড় প্রতি ১২-১৫ টি) এবং নামলা আখের বেলায় ১.৫-২.০ লক্ষ (ঝাড় প্রতি ৬-৮ টি) কুশি হওয়ার পর আর নতুন কুশি হতে না দিয়ে ঝাড়ের গোড়ায় মাটি দিতে হবে। এর একমাস পর দিতীয় ও শেষবার মাটি উঠিয়ে দিতে হবে।

ডিট্রাসিং (মরা পাতা পরিষ্কার করা):

  • আখের মরা পাতা পরিষ্কার করলে পোকা ও রোগের আক্রমণ কম হয়। আখের হেলে পড়া রোধ হয়, কান্ডের রং উজ্জ্বল হয় এবং আখের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়।
  • ফলন ও চিনি আহরণ হার বৃদ্ধি পায় ফলে আয় বেশী হয়।

আখ ঝাড় বাঁধা :
আখ হেলে পড়লে কান্ডের বৃদ্ধি মন্থর হয়, পার্শ্বকুশি গজায়, ওজন ও চিনির পরিমান কমে যায় এবং কিছু আখ মরেও যায়। আখের কান্ড গঠন হওয়ার পর অতিবৃষ্টি বা ঝড়ো হাওয়ায় গাছ হেলে পড়তে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সাধারণতঃ ভাদ্র থেকে কার্তিক ( আগষ্ট-অক্টোবর ) মাস পর্যন্ত আখ হেলে পড়তে দেখা যায়। আখ হেলে পড়ার আশংকা দেখা দিলেই প্রথমে আখের শুকনো/ আধা শুকনো পাতা দিয়ে প্রতিটি ঝাড় আলাদাভাবে বাঁধতে হবে এবং পরে দুই সারির তিন অথবা চারটি ঝাড় একত্র করে আড়াআড়ি বাঁধতে হবে।আখ বাঁধার সময় সবুজ পাতা ব্যবহার করা উচিত নয় এবং লক্ষ্য রাখতে হবে যেন আখের ডগা যতটা সম্ভব আলাদা থাকে। যথাযথভাবে বাঁধা হলে আখ সোজা থাকে, দীর্ঘ হয়, চিনির হার স্বাভাবিক থাকে এবং সর্বোপরি ফলন বৃদ্ধি পায়। আখ হেলে পড়লে বীজ আখের গুণাগুণ নষ্ট হয়। হেলে পড়া বীজ আখে পার্শ্বকুশি গজায় ও কান্ডে শিকড় গজিয়ে বীজ আখকে ব্যবহারের অযোগ্য করে তোলে। তাই বীজ আখ ক্ষেতে আখ বাঁধা অপরিহার্য।

সেচ প্রয়োগ ও অতিরিক্ত পানি নিষ্কাষন :
আখের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য মাটিতে প্রয়োজনীয় রস না থাকলে তা আখের ফলনের উপর বিরম্নপ প্রভাব ফেলে। সে জন্য প্রয়োজনমতো সেচ প্রয়োগ করা যেতে পারে। পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে যে, কেবলমাত্র সেচ প্রয়োগ করেই আখের ফলন ২০-২৫% বৃদ্ধি করা সম্ভব। আগাম আখ চাষের জন্য ৫ টি সেচ প্রয়োগ করে আখের ফলন উলেস্নখযোগ্য পরিমানে বৃদ্ধি করা যায়। এক্ষেত্রে আখ রোপণের ১-৭, ৩০-৩৫, ৬০-৬৫, ১২০-১২৫ এবং ১৫০-১৫৫ দিন পর যথাক্রমে ৬.০০, ৮.৫০, ১১.০০ এবং ১৩.৫০ সেঃ মিঃ গভীরতায় সেচ প্রয়োগ করতে হবে। তবে যথেষ্ট বৃষ্টিপাত হলে ঐ সময় সেচ না দিলেও চলবে। অবশ্য পরবর্তী সেচ সমূহ প্রয়োজনমতো প্রয়োগ করতে হবে। যে সমস্ত্ম স্থানে খরায় আখের ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকে অথচ সেচ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই সে সমস্ত এলাকায় ইক্ষুচাষ করার সময় খরা সহিষ্ণু ইক্ষু জাত চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।

আধুনিক/উন্নত ভাবে মুড়ি আখের চাষ :

  • ভাল মুড়ি হয় এমন জাত নির্বাচন করা;
  • আখ আগাম কর্তন করা;
  • মূল আখ ক্ষেতে গ্যাপ পূরণের জন্য পূর্বেই উৎপাদিত চারা দিয়ে গ্যঅপ পূরণ করা, এতে ২৫% ফলন বেড়ে যায়;
  • মুড়ি আখ চাষের জন্য সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে রোপা পদ্ধতিতে মূল আখ চাষ করতে হবে;
  • বিঘা প্রতি ৩৫-৫৫ মণ পচা গোবর সার অথবা ৬০ কেজি খৈল ব্যবহার করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়;
  • মূল আখের চেয়ে বিঘা প্রতি ১৩ কেজি ইউরিয়া বেশী প্রয়োগ করতে হবে;
  • সেচের সুবিধা থাকলে মুড়ি আখের সাথে সাথী ফসল চাষ করা যায়।

মুড়ি আখ চাষে মূল আখের তুলনায় ২৫-৩০% উৎপাদন ব্যয় কম হয়। মুড়ি আখ আগাম পরিপক্কতা লাভ করে ও এতে চিনি আহরণের হার ০.৫-১% বৃদ্ধি পায়। মুড়ি আখ চাষ অধিক লাভজনক।

তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই), ঈশ্বরদী, পাবনা

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২১