জলবায়ু ও মাটিঃ
পটল গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং ফলনের জন্য উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়া দরকার। এ জন্য খরিপ মৌসুম পটল চাষের উপযুক্ত সময়। পানি ষ্কিাশনের সুবিধা আছে এমন উঁচু ও মাঝারী উঁচু জমি এবং বেলে দো-আঁশ থেকে দো-আঁশ মাটি পটল চাষের জন্য উপযোগী। পটল বেশ খরা সহিষ্ণু। তবে পানির ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে ফলন কমে যায়।।

রোপণের সময়ঃ

বাংলাদেশে বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাস এবং শীতের শেষে ফাল্গুন-চৈত্র মাস পটল লাগানোর উপযুক্ত সময়। আশ্বিন-কার্র্তিক মাসে পটলের কাটিং বা শিকড় লাগালে তীব্র শীত শুরুর আগেই গাছের কিছুটা অংগজ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এতে জীবনকাল কিছুটা দীর্ঘায়িত হলেও ফালগুন-চৈত্র মাসে আগাম ফলন পাওয়া যায় এবং বাজারমূল্য বেশি পাওয়া যায়। বৃষ্টিবহুল এলাকায় বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে অবশ্যই আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল লাগানো উচিত। ফালগুন-চৈত্র মাসে পটল লাগালে গাছ দ্রুত বাড়ে, জীবনকাল কমে যায় এবং জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে ফল আসা শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পানের বরজে ছায়াদানকারী গাছ হিসাবে আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল লাগানো হয়। চরাঞ্চলে বর্ষজীবি ফসল হিসাবে প্রতি বছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল চাষ করা হয়। পলিব্যাগে চারা করে মূল জমিতে শ্রাবন-ভাদ্র মাসে লাগানো গেলে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ফলন পাওয়া যায়।

বারি পটল-১ ও বারি পটল-২ এর ক্ষেত্রে কলম লাগানোর ৯০-৯৫ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়

পটল আলোক সংবেদী হওয়ায় কয়েক দফায় পটল লাগানো যায় এবং সারা বছর ফলন পাওয়া যায়।

চারা উৎপাদনঃ

পটল একটি পরপরাগায়িত উদ্ভিদ। এর স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা গাছে ফোটে। বীজ দ্বারা এর বংশবিস্তার করা হয় না। বীজ থেকে জন্মানো গাছে ফুল আসতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। কন্দমূল অথবা কান্ডের শাখা কলম দিয়ে পটলের বংশবিস্তার করা হয়। শাখা কলমের ক্ষেত্রে পরিপক্ক কান্ড ব্যবহার করা হয়। পটলের কান্ড মরে গেলেও মূল জীবিত থাকে। শীতের শেষে কান্ড থেকে নতুন চারা বের হয়। পটলের শাখা কলম বা লতার কাটিং করার জন্য একাধিক পদ্ধতি রয়েছে। যেমন-

  • প্রায় এক বছর বয়সের মোটা আকারের লতা ২০ ইঞ্চি বা একটু বেশি লম্বা করে কেটে নিয়ে রিংয়ের মত করে পেঁচিয়ে মূল জমিতে বেডে লাগানো যায়। এতে ৪-৫ টি গিট মাটির নিচে থাকে এবং একটি গিট মাটির উপরে থাকে।
  • মূল জমির বেডে নির্দ্দিষ্ট দূরত্বে লাঙ্গল দিয়ে ৬ ইঞ্চি গভীর নালা করে পরিপক্ক লতা লম্বা করে নালায় বিছিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে লতার দুই প্রান্ত মাটির উপরে উন্মুক্ত থাকে।
  • পরিপক্ক লতা কেটে রিংয়ের মতো করে পেঁচিয়ে বাড়িতে বা নার্সারীতে ছায়ায় লাগানো হয়। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গিট মাটি দিয়ে ঢাকা থাকে। এরপর গজানো চারা মুলসহ উঠিয়ে নিয়ে বেডে লাগানো হয়।
  • শাখাকলম লাগানোর সময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে কলম শুকিয়ে মারা যায়। এক্ষেত্রে পরিব্যাগে চারা গজিয়ে নিলে মূল জমিতে সময় মতো লাগানো যায়। এ পদ্ধতিতে খরচ কিছুটা বাড়লেও চারার মৃত্যুর হার অনেক কমে যায় ফলে মোট উৎপাদন বেড়ে যায়।
  • মাটিতে আর্দ্রতা কম থাকলে একটু গভীরে শাখা কলম লাগাতে হয়। তবে বেশি আর্দ্র জমিতে কলম লাগালে তা পচে যেতে পারে।

 

জমি তৈরী ও চারা রোপণঃ

পটলের জমি গভীর করে ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করে নিতে হয়। এতে পটলের মূলের বিস্তার সহজ হয় এবং গাছ সহজেই মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে। জমি চাষ করার পর বেড তৈরি করে নিতে হয়ে। বেড পদ্ধতিতে পটল চাষ করা ভাল। এতে বর্ষাকালে ক্ষেত নষ্ট হয় না। রোপণ পদ্ধতির উপর নির্ভর করে বেডের প্রস্থ ও রোপণ দূরত্ব কম-বেশি হয়ে থাকে। জমির দৈর্ঘ্য বরাবর সাড়ে ৫ হাত  চওড়া বেড তৈরি করে নিয়ে পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝে ১ ফুট প্রস্থ এবং ৮ ইঞ্চি গভীর নালা রাখতে হয়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়।  প্রতি বেডে সাড়ে ৪ হাত দূরত্বে লাঙ্গল দিয়ে ৫-৬ ইঞ্চি গভীর করে দুটি নালা করে নিতে হয়।  প্রতি নালায় ২০ ইঞ্চি পর পর ৫-৬ ইঞ্চি গভীরে শাখা কলম লাগাতে হয়। দেশের বৃষ্টিবহুল এলাকায়, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে, চাষের জন্য বেডের প্রস্থ হবে সোয়া ৩ হাত। প্রতি বেডের মাঝ বরাবর এক সারিতে সোয়া ৩ হাত দূরে দূরে  মাদা তৈরি করে মাদায় চারা রোপণ করতে হয়।  মাদার আকার হবে যথাক্রমে ২০ ইঞ্চি × ২০ ইঞ্চি × ২০ ইঞ্চি। এক্ষেত্রে সেচনালার প্রস্থ হবে ১৬-১৮ ইঞ্চি।  একসঙ্গে চারা লাগালেও স্ত্রী ফুলের ১০-১৫ দিন পরে পটলের পুরুষ ফুল ফোটে। পুরুষ ফুলের অভাবে প্রথম দিকে ফোটা স্ত্রী ফুলগুলিতে ফল হয় না। তাই মূল জমিতে সারিতে বা মাদায় প্রতি ১০ টি স্ত্রী গাছের পর পর একটি পুরুষ গাছ ১০-১৫ দিন আগেই লাগানো উচিত।

সুষ্ঠু পরাগায়নের জন্য প্রতি ৯টি স্ত্রী গাছের জন্য ১ টি পুরুষ থাকা আবশ্যক। পুরুষ গাছগুলো পুরো জমিতে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকতে হবে।

সূত্রঃ http://agrinewsbd.com

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২১