সীম চাষে একটি জরুরী প্রযুক্তি প্যাচ ছাড়ানো। সীম গাছ পরস্পর ৪০-৪৫ দিন বয়স হলে পেচিয়ে যায়। এতে গাছের ডগার বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফুল ফল ধরে না । এজন্য হাত দিয়ে মাঝে মাঝে গাছের প্যাচ ছাড়িয়ে দিতে হয়। এছাড়া গাছের গোড়া থেকে মাচায় উঠা পর্যন্ত পাশ্ব ডাল বের হলে তা কাটা ও মাচায় উঠে গাছ ছড়িয়ে গেলে তার ডগা কাটা দরকার। এতে প্রচুর নতুন শাখা প্রশাখা বের হয়, মাচা দ্রুত গাছে ভরে যায় এবং ফুল ও ফলের পরিমান বেড়ে যায়।

পরিচর্যা:
কোন অবস্থাতেই গাছের গোড়ায় পানি যাতে না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে জমিতে প্রয়োজন মত সেচ দিতে হবে। মাঝে মাঝে মাটি নিড়ানি দিয়ে আলগা করে দিতে হবে। এছাড়া গাছ যখন ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হবে তখন মাদায় গাছের গোড়ার পাশে বাঁশের ডগা মাটিতে পুঁতে বাউনির ব্যবস্থা করতে হবে।

ডিকয়েলিংঃ  চারার বয়স ৪০-৪৫ হলে শিমের ডগা পরস্পর প্যাচ লেগে যায়। এতে ডগার বৃ্দ্ধি এবং ফুল-ফল ধারণ ব্যহত হয়। এজন্য প্যাচ ছাড়িয়ে দিতে হয়। একে ডিকয়েলিং বলে।

আগাম শিম চাষ

চাষ পদ্ধতিঃ

এঁটেল মাটি ছাড়া প্রায় সব ধরনের মাটিতে শিম চাষ করা যায়। তবে দোআঁশ মাটিতে শিম চাষ সবচেয়ে উত্তম। আগামী শিম চাষের জন্য বপনের উপযুক্ত সময় হচ্ছে আষাঢ় থেকে পুরো ভাদ্র মাস পর্যন্ত। আগাম চাষের জন্য স্থানীয় জাত হচ্ছে-কার্ত্তিকা বা বাঘনখা আর উন্নত জাতগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত বারি-১, বারি-২, বারি-৫ (খাটো) ও বারি-৬। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য জমি নির্বাচন করে ৩/৪টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করে নিতে হবে। তারপর ৮ থেকে ১০ ফুট (২ থেকে ৩ মিটার) দূরে দূরে মাদা বা গর্ত তৈরি করে নিতে হবে। ৩ ফুট চওড়া ও ২.৫ ফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটি গর্তের একপাশে এক সপ্তাহ রেখে গর্তে আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা নিতে হবে। সপ্তাহ পর প্রতি মাদায় বা গর্তে পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার ১০ কেজি, খৈল সার ২০০ গ্রাম, ট্রিপল সুপার ফসফেট সার ১২৫ গ্রাম ও ছাই ২ কেজি একত্রে গর্তের পাশে রাখা ওপরের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে দিতে হবে। তারপর প্রতি মাদায় বা গর্তে ৩/৪টি সুস্থ-সবল নিরোগ বীজ বুনতে হবে। চারা গজানোর সুবিধার্থে ১০-১২ ঘণ্টা বীজকে ভিজিয়ে রেখে তারপর গর্ত বা মাদায় বুনতে হবে। বীজ বোনার পর মাদায় রস না থাকলে হালকাভাবে পানি সেচ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য বিঘাপ্রতি এক থেকে সোয়া কেজি বীজের প্রয়োজন হয়ে থাকে।

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা 

বীজ বপনের সময় বৃষ্টি থাকতে পারে তাই চারার গোড়ায় যাতে পানি না জমে সেদিকটা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। ঠিকমতো চারার বাড়-বাড়তি ও ভালো ফলনের জন্য চারা গজানোর ২ সপ্তাহ ও ৬ সপ্তাহ পর ইউরিয়া ও মিউরেট অব পটাশ সার ৫০ গ্রাম করে একত্রে মিশিয়ে মাদায় চারার চারিধারে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে হালকাভাবে পানি সেচ দিতে হবে। চারার বাড়-বাড়তি ও ভালো ফলনের জন্য বাউনি/ জাংলা বা মাচা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। আগাছা থাকলে তা দ্রুত দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। মাঝে মাঝে চারার গোড়ার মাটি আলগা করে ভালো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে শিকড় মজবুত ও গাছের বৃদ্ধি ভালো হবে। বর্ষা বা সেচের পানি চারার গোড়ায় জমতে না পারে সে জন্য নালার ব্যবস্থা রাখতে হবে। শিম ক্ষেতে রোগের তেমন আক্রমণ হয় না তবে জাব পোকা ও শোষক পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। যাব পোকার আক্রমণ হলে কেরোসিন মেশানো ছাই সকালবেলা ছিটিয়ে দিতে হবে। (১ কেজি পরিমাণ ছাইয়ের সঙ্গে কয়েক ফোটা কেরোসিন)। এছাড়া এসব পোকা দমনের জন্য সাবান/ডিটারজেন্ট পাউডার গোলা পানি স্প্রে করতে হবে। এতেও যদি দমন করা সম্ভব না হয় তাহলে থিয়ন গ্রুপের অনুমোদিত যে কোনো তরল কীটনাশক ১০ লিটার পানিতে ৪ মি.লিটার মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে কর দিতে হবে। চারা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারার আগাতে যে আকর্ষি থাকে তা একটির সঙ্গে আরেকটি জড়াজড়ি করে বাড়তে থাকে। এই আকর্ষিগুলো প্রতিদিন ক্ষেত পরিদর্শনের সময় হাত দিয়ে ছাড়িয়ে দিতে হবে।
সঠিক যত্ন-পরিচর্যা নিলে বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ মণ ফলন পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শের জন্য নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিস কিংবা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।

রোপনের আগে পরে করনীয় ও পরিচর্যা:

আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত দেশী শিমের বীজ বপন করার সময়। তবে শ্রাবণ মাস উপযুক্ত সময়। যে মাসেই বীজ বপন করা হোক, অগ্রহায়ণের শেষ বা কার্তিক শুরুর আগে কোনো গাছেই ফুল ও ফল ধরে না। ব্যতিক্রম বারমাসী জাত। দেশী শিমে যেহেতু আগাম, মাঝারি ও নাবী জাত আছে, তাই জাতের সঠিক তথ্য না জেনে চাষ করলে সময়মতো ফলন পাওয়া যায় না। দেশী শিম ক্ষেত ছাড়াও বসতবাড়ির দেয়ালের পাশে, আঙিনার ধারে ছোট মাচায়, ঘরের চালে, পুকুর ও রাস্তার ধারে এবং ক্ষেতের আইলে চাষ করা যায়। ক্ষেতে চাষ ও মই দিয়ে জমি ভালোভাবে ঝুরঝুরে ও সমান করে নিতে হয়। এর পর ১০ ফুট দূরত্বে সারি করে সারিতে ৫ ফুট পর পর গর্ত বা মাদা তৈরি করতে হয়। দেড় ফুট চওড়া ও দেড় ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে গর্তের মাটির সাথে ১০ কেজি জৈব বা গোবর সার, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ৫০ গ্রাম এমওপি সার মিশিয়ে ৬ থেকে ৭ দিন রেখে দিতে হয়। এতে সার চারাগাছের গ্রহণ উপযোগী হতে পারে। অন্যান্য স্খানে লাগানোর জন্য একই রকম গর্ত ও সার ব্যবহার করতে হয়। প্রতি শতক জমিতে ৪০-৫০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। প্রতি মাদায় ৩-৪টি বীজ বপন করতে হয়। চারা গজালে ১ বা ২টি সুস্খ ও সবল চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হয়। তবে বীজের স্বল্পতা থাকলে বা ভালো চারা রোপণ করতে চাইলে পলিব্যাগে বীজ থেকে চারা তৈরি করে নেয়া যায়। এতে বাছাই করা সুস্খ-সবল রোগ বা পোকামুক্ত শিমের চারা মাদায় রোপণ করা যায়। অন্য দিকে বৃষ্টির কারণে জমিতে বীজ বপন করতে না পারলে কিংবা জমিতে অন্য ফসল থাকলে সময়মতো পলিব্যাগে চারা তৈরি করা ভালো। চারা গজানোর পর গাছে শাখা-প্রশাখা না আসা অথবা ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হলে গোড়ার মাটি কুপিয়ে আলগা রাখাসহ আগাছা জন্মাতে দেয়া ঠিক নয়। গাছ কিছুটা লম্বা হলে প্রথমে কাঠি ও পরে বাউনির জন্য মাচার ব্যবস্খা করতে হয়। বৃষ্টির পানি যাতে গাছের গোড়ায় জমে না থাকে সে জন্য নিষ্কাশনের নালা কেটে রাখতে হয়। বৃষ্টিতে গাছের গোড়ার মাটি ধুয়ে গেলে মাটি দিয়ে গোড়ার চার দিক এমনভাবে উঁচু করে দিতে হয় যাতে পানি সহজেই গড়িয়ে যায়। এ সময়ে গাছের গোড়ার দিকের প্রথম ২ থেকে ৩টি পার্শ্ব শাখা ছাঁটাই করে দিতে হয়। এই শাখাগুলো থেকে তেমন একটা ফল পাওয়া যায় না। শিমের চারা বড় হতে থাকলে অর্থাৎ মাচায় উঠতে শুরু করলে ১ম বার ৫০ গ্রাম করে ইউরিয়া ও এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হয়। এর পর গাছের বৃদ্ধির ধরন অনুযায়ী ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর আরো ২ বার একই হারে সার উপরি প্রয়োগ করা যায়। তবে গাছের বৃদ্ধি ভালো হলে বা পাতার সংখ্যা বেশি হলে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ না করাই ভালো।

উৎসঃ  http://info.totthoapa.gov.bd, http://www.infokosh.gov.bd এবং কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী (ডিপ্লোমা কৃষিবিদ তুষার কুমার সাহা)

Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২১